
কাজী আশরাফুল আলম
টঙ্গী গাজীপুর
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ সারা দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। টার্মিনাল, রেলস্টেশন, নদীবন্দর, রিকশাস্ট্যান্ড কিংবা ব্যস্ত মার্কেট—সর্বত্রই যেন একই চিত্র। ভাড়া পরিশোধ করতে গেলে চার-পাঁচজন ভিক্ষুক ঘিরে ধরে। সাধারণ নাগরিকের কাছে এই দৃশ্য এখন রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ফাঁকফোকরকে তুলে ধরে ।
প্রতিদিন ১৫-২৫ জনের সমাগম
রাজধানীর দোকানদার ও পথচারীরা জানান, প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২৫ জন ভিক্ষুক তাদের কাছে সাহায্য চান । কেবল রাজধানী নয়, গাইবান্ধার মতো জেলাগুলিতেও একই চিত্র। হকার্স মার্কেট, নতুন বাজার, রেলওয়ে স্টেশন, বাস স্ট্যান্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে প্রতিদিন ভিক্ষুকদের উপস্থিতি লক্ষণীয় ।
মূল কারণ: মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব
সামাজিক কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাব, কার্তিক মাসে (অক্টোবর-নভেম্বর) কাজ না থাকা এবং অতিবৃষ্টির কারণে ফসলহানির ফলে দারিদ্র্য বেড়েছে। এছাড়া করোনা-পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি এই সমস্যাকে আরও গভীর করেছে ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, অক্টোবরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২.৫৬ শতাংশ, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ।
পেশাদার ভিক্ষুক ও চক্র
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে অনেক পেশাদার ভিক্ষুক রয়েছেন যারা শারীরিকভাবে কাজ করার সক্ষম হয়েও ভিক্ষাকে সহজ আয়ের পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন । সম্প্রতি ঢাকা আহসানিয়া মিশন দাবি করেছে, রাজধানীতে ভিক্ষাবৃত্তি ও মানবপাচারের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা দরিদ্রদের দুরবস্থাকে পুঁজি করছে । দিনাজপুরের একটি জরিপ বলছে, প্রতিদিন ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকার লেনদেন হয় ।
সঠিক পরিসংখ্যানের অভাবে পদক্ষেপ সীমিত
সামাজিক কল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সংসদে জানিয়েছেন, দেশে ভিক্ষুকের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০১৭ সালের একটি তালিকার ভিত্তিতে ধারণা করা হয় দেশে প্রায় আড়াই লাখ ভিক্ষুক রয়েছেন, যার মধ্যে রাজধানীতেই ২০ হাজার ।
পুনর্বাসন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সংকট
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘ভিক্ষাবৃত্তি থেকে জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ কর্মসূচি ২০১০ সাল থেকে চললেও সফলতা সীমিত। ২০১০-১১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে মাত্র ১৪,৭০৭ জন ভিক্ষুক এই কর্মসূচির আওতায় এসেছেন ।
মানবাধিকার ও উন্নয়ন কেন্দ্রের সচিব বলেন, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে দিন দিন ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়ছে ।
সর্বত্র ভিক্ষুকের উপস্থিতি আমাদের সমাজের একটি কঠিন বাস্তবতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানসিক পরামর্শের মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব ।
