
কাজী আশরাফুল আলম
ঢাকা, ২৯ জুলাই ২০২৬: দেশব্যাপী তীব্র গ্যাসসংকটে এখন স্থবিরতার পথে বাংলাদেশের শিল্পখাত। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, গ্যাসের অভাবে টেক্সটাইল, ওয়াশিং, ফার্মাসিউটিক্যালসহ বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করায় শিল্প মালিকরা এখন সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
সম্প্রতি গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের একাধিক ওয়াশ ফ্যাক্টরি ও ভারী শিল্পকারখানা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে অধিকাংশ মেশিনই সচল রাখা যাচ্ছে না। অনেক কারখানায় জেনারেটর চালিয়েও উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু সেটা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। কারখানা মালিকরা জানান, অর্ডার মেটাতে না পেরে তারা প্রতি দিন বিপুল অর্থ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
শুধু শিল্পকারখানা নয়, গ্যাস সিলিন্ডার পাম্পগুলোতেও একই চিত্র। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সিলিন্ডারে গ্যাস ভরাতে ভোরে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকেই ফিরছেন খালি হাতে। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদার তুলনায় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও রান্নার জন্য এই গ্যাসের প্রয়োজনীয়তা এখন চরমে।
আর সবচেয়ে বিপর্যস্ত সাধারণ ভোক্তারা। বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাস সেটা তো দূরের কথা—চুলায় আগুন জ্বালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো চাপ কমে যাওয়া এবং সিলিন্ডারের মূল্যবৃদ্ধির দ্বৈত সংকটে পড়েছেন। অনেকে কাঠ বা বৈদ্যুতিক চুলায় ফিরে গেলেও, তা সবার জন্য সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত থেকে গ্যাস আমদানি বন্ধ, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন হ্রাস এবং শীতকালীন চাহিদা বৃদ্ধিই এই সংকটের প্রধান কারণ। তবে শিল্প মালিকরা অভিযোগ করেছেন, বিদ্যুৎখাতে যেমন অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, গ্যাসের বরাদ্দেও তেমনটি করা হচ্ছে না। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সংকট সমাধান না হলে বড় ধরনের শিল্পপতন ঘটতে পারে, যা অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি।
বাংলাদেশ শিল্প মালিক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প মালিকরা ইতোমধ্যে জ্বালানি বিভাগে স্মারকলিপি দিয়েছেন। তারা জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানি বাড়ানো এবং উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর জন্য আলাদা গ্যাস লাইন দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। তবে তারা স্বীকার করেছেন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে এই সংকট কাটাতে সময় লাগবে।
তবে সাধারণ মানুষ ও শিল্প উদ্যোক্তারা একবাক্যে বলছেন, এই ‘গ্যাসহীন গ্রীষ্ম’ যেন বাংলাদেশের শিল্পের ‘কালো অধ্যায়’ না হয়ে ওঠে, সেদিকে এখনই নজর দিতে হবে।
