
বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক সেবা চালু করল স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট-সেবা স্টারলিংক। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির এই যাত্রা দেশের ডিজিটাল সংযোগের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। মঙ্গলবার রাজধানীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি জানানো হয়। এর আগে স্টারলিংক এক্স-এ দেওয়া একটি পোস্টে বাংলাদেশের বাজারে কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেয়।
ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্টারলিংক মূলত দুর্বোধ্য ও দুর্গম অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বাংলাদেশেও সেই লক্ষ্যেই এ সেবা চালু করা হয়েছে। গ্রামে বা শহরবন্দরে ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা যেখানে প্রকট, সেখানে স্টারলিংকের মাধ্যমে স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে সরকার আশা করছে।
স্টারলিংক সেবা পেতে হলে ব্যবহারকারীকে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে গিয়ে ‘রেসিডেনশিয়াল’ অপশন বেছে নিতে হবে। এরপর নিজের অবস্থান নির্বাচন করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অর্ডার নিশ্চিত করতে হবে। সরঞ্জাম পাঠিয়ে দিতে সময় লাগবে তিন থেকে চার সপ্তাহ। ব্যবহারকারী নিজেই সহজে এটি সেটআপ করতে পারবেন বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সরঞ্জাম বাবদ খরচ হবে এককালীন ৪৭ হাজার টাকা, যাতে অ্যান্টেনা, কিকস্ট্যান্ড, রাউটার, বিদ্যুৎ সংযোগ ও তারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বর্তমানে দুটি প্যাকেজ চালু রয়েছে—‘স্টারলিংক রেসিডেন্স’ মাসিক ৬ হাজার টাকায় এবং অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী ‘রেসিডেন্স লাইট’ মাসে ৪ হাজার ২০০ টাকায় ব্যবহার করা যাবে। একেকটি সেটআপ ডিভাইস ৫০ মিটার পর্যন্ত এলাকা জুড়ে ইন্টারনেট সেবা দিতে পারবে, যা গ্রামাঞ্চলে কিছুটা বেশি, প্রায় ৬০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে।
এ সেবা ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের পাশাপাশি সমবায় ভিত্তিতেও ব্যবহার করা যাবে। অর্থাৎ একাধিক ব্যক্তি মিলে একটি ডিভাইস কিনে তা ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারবেন, যা গ্রামীণ এলাকাগুলোর জন্য বিশেষভাবে উপযোগী হয়ে উঠবে।
স্টারলিংকের দ্রুত অনুমোদন ও কার্যক্রম শুরুকে কেন্দ্র করে সরকারের উদ্দেশ্য ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি–বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, এ ক্ষেত্রে কোনো তড়িঘড়ি হয়নি। বরং সরকারের উদ্দেশ্য ছিল দেশের ইন্টারনেট কাঠামোকে আরও নির্ভরযোগ্য ও বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা। তিনি জানান, দেশে বর্তমানে মোবাইল টাওয়ারগুলোর মাত্র ৩০ শতাংশ ফাইবার অপটিকের মাধ্যমে যুক্ত, বাকি অংশ মাইক্রোওয়েভ নির্ভর। এতে ইন্টারনেট গতি ও স্থায়িত্বে সমস্যা হয়। স্টারলিংক সেই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে স্টারলিংক ৯০ দিনের পরীক্ষামূলক বাণিজ্যিক কার্যক্রমে রয়েছে, যার জন্য তারা বিদেশি গেটওয়ে ব্যবহার করছে। তবে এরপর স্থানীয় গেটওয়ে ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এনটিএমসি’র সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছে এবং তারা আইনানুগ নজরদারি মেনে চলবে।
এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ ভুটান ও শ্রীলঙ্কাতেও স্টারলিংক তাদের যাত্রা শুরু করেছে। তবে শ্রীলঙ্কায় নিরাপত্তার কারণে কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও সরকার বলছে, স্থানীয় গেটওয়ে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা এবং ডিভাইস আমদানির ক্ষেত্রে ছাড়পত্রের মাধ্যমে সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
২০২১ সাল থেকেই স্টারলিংক বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছিল। তবে শুরুতে সরকারিভাবে সাড়া না পেলেও ২০২৩ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে তাদের তৎপরতা বাড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি আরও দ্রুত গতি পায়। ২০২৪ সালের ২৯ মার্চ বিনিয়োগ নিবন্ধন এবং ২৯ এপ্রিল বিটিআরসি থেকে ১০ বছরের লাইসেন্স প্রাপ্তির মাধ্যমে স্টারলিংকের বাণিজ্যিক যাত্রা নিশ্চিত হয়।
সরকার আশা করছে, স্টারলিংকের উপস্থিতি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে এবং এর অনুকরণে অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যেমন অ্যামাজন কুইপার, টেলিসেট, ওয়ান ওয়েব এবং চীনের জিডব্লিউ-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশের বাজারে আগ্রহী হবে। এটি দেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবে বলেই সরকারের বিশ্বাস।
